মনিরার সঙ্গে মধুপুর শালবন;শিক্ষাজীবনের শেষ ভ্রমণ
মোছাঃ ফাতেমা জান্নাতি
শীতের শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো একটি সকাল। বগুড়া শহর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, অথচ আমাদের উত্তেজনা ভোরের অন্ধকার ভেদ করে অনেক আগেই সাড়া দিয়ে উঠেছিল। সরকারি আজিজুল হক কলেজের বিশাল মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৩টি বড় বাসের সামনে আমাদের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের এমবিএ ফাইনাল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যেন প্রত্যেকেই নতুন আলো খুঁজে ফিরছিল। এটি শুধু একটি শিক্ষাসফর নয়, এটি আমাদের শিক্ষাজীবনের শেষ যৌথ ভ্রমণ; এমন এক যাত্রা, যা শেষের শুরু এবং শুরুর শেষের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।
আমি আর মনিরা মাঠের ভেজা ঘাসে হেঁটে এসে দেখি অনেকে ইতোমধ্যে জড়ো হয়ে গেছে। কেউ ছবি তুলছে,কেউ কেউ গল্প করছে।একে একে এসে উপস্থিত হলেন রকিবুল হক মুন্সি স্যার,জুয়েল স্যারসহ সকল স্যার ও আমাদের সহপাঠীরা।
বাসে উঠে বসতেই জানালার কাঁচে স্নিগ্ধ সকাল এসে ধাক্কা খেল। পথের ধারে দোকানগুলো তখনো আধা ঘুমে; কেউ চা বানাচ্ছে, কেউ খুপরি থেকে ধোঁয়া উড়িয়ে নিচ্ছে। ইঞ্জিনের গর্জন আমাদের সবাইকে একই ছন্দে বেঁধে দিল।
বাস ছাড়তেই বগুড়ার সকালের বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ল। আমার পাশে বসেছিল আমার বান্ধবী মনিরা। আমরা দু’জন চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভ্রমণের প্রথম নীরবতাটা সবসময়ই ভিন্ন। এটি এক ধরনের সেতুবন্ধন, যেখানে পুরোনো স্মৃতি, নতুন দিনের আলো এবং অচেনা পথের উত্তেজনা একসঙ্গে ধাবমান হয়। একটু পর সাউন্ড বক্সে হিন্দি গান হাততালি আর নাচ পিকনিকের আনন্দ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
বগুড়ার পরিচিত দালান ,শপিংমল , বিজ্ঞাপনের বোর্ড ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে গেল। টাঙ্গাইলের দিকে এগোতে এগোতেই রাস্তার রঙ বদলে যেতে লাগল।
রাস্তার ধুলো এবং বাতাসের গন্ধও বদলে যাচ্ছিল। শহরের পরিচিত ধুলোমাখা ঘ্রাণ নেই, বদলে এসেছে নরম, আর্দ্র, বনভূমির আগমন বার্তা। মধুপুর পৌঁছানোর আগে রাস্তা আরও নরম হয়ে উঠল। হঠাৎই দূরে লম্বা শালের সারি চোখে পড়ল। প্রথমে মনে হলো চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে—এতো উঁচু, এতো অভিন্ন, এতো নিঃশব্দ গাছগুলো কি সত্যিই বাস্তব? বাস যখন তাদের দিকে আরও কাছে এগোতে লাগল, তখন বুঝলাম শালগাছের এই রাজত্ব আসলেই বনের প্রথম দ্বার। শালপাতা হালকা বাতাসে দুলছে। সেই শব্দ—খসখস, শোঁশোঁ, টুপটাপ—সব মিলিয়ে এমন ছন্দ তৈরি করছিল যা শহরের কোনোকিছুতেই পাওয়া যায় না।
বাতাসে ভেসে আসছিল লাল মাটির গন্ধ।বাস যখন গেট পার হলো, মনে হলো একেবারে অন্য জগতে ঢুকে পড়লাম। শহর, কলেজ, ক্লাস, কোচিং,ক্লান্তি, সব যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। শালগাছ দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো, যেন বহু যুগ ধরে পাহারা দিচ্ছে এই বনকে। তারা শুধু গাছ নয়, তারা সময়ের লম্বা স্মৃতিস্তম্ভ। আমি বাস থেকে নেমে মুকুল স্যারকে দেখে অবাক হই অনেকদিন পর স্যারের সাথে দেখা ও কুশল বিনিময়ের পর রেস্ট হাউসে ফ্রেশ হলাম এর পর রেস্ট হাউসের সামনে সুন্দর বসার জায়গায় বসে প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হলাম আমি আর মনিরা। এরমাঝে আমাদের কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ এসে উপস্থিত হলেন। স্যারের সাথে কথা বলতে বলতে দেখলাম ছোট ছোট দলে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে।আমরা অপেক্ষা করছিলাম স্যারদের সাথে যাওয়ার জন্য। অল্প কিছু সময় পর স্যারদের সাথে আমরা বেরিয়ে পরলাম।বনের ভেতর প্রথম পা রাখতেই এক ধরনের স্পষ্ট ঠাণ্ডা অনুভূতি পেলাম। মাটির নরম অবস্থান বোঝাল, এখানে গাছের শিকড়গুলো ভর করে আছে, নিজের মতো ছড়িয়ে আছে, প্রাকৃতিক স্থিরতার ওপর দাঁড়িয়ে। শালপাতার নিচে আলো ছায়া হয়ে পড়ছে। প্রতিটি ছায়া যেন বনের নিজস্ব অক্ষর, যার মাধ্যমে সে কথা বলে। আমি হেঁটে চললাম। কারও হাসির শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। বন্ধুরা কেউ ছবি তুলছিল, কেউ গাছের গোড়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল।
গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, শিকড়গুলো এক গাছ থেকে আরেক গাছে গিয়ে মিশেছে। মনে হলো তারা একে অপরকে ধরে রেখেছে।বনের মাঝখানে ওয়াচ টাওয়ারে আমরা উঠলাম জুয়েল স্যার ও উজ্জ্বল স্যারের সাথে। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে দাঁড়াতেই চোখের সামনে খুলে গেল এক বিশাল সবুজ সমুদ্র। শালগাছের ঢেউ, রাবার বাগানের সমতল রেখা, টিলা, ঝোপ, পথ—সব মিলিয়ে মনে হলো পৃথিবী এই জায়গায় এসে এক জায়গায় থেমে গেছে। বাতাস মুখে এসে পড়ছিল। বন্ধুরা ছবি তুলছিল, কেউ নিচে তাকিয়ে ভয় পাচ্ছিল।অথচ আমার মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে আমি সত্যিই সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।
ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে আমরা রাবার বাগানের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশের টং দোকানে বসলাম সবাই মিলে জুয়েল স্যারের সাথে শুকনো মুড়ি, লাড্ডু,বিস্কুট আর টিউবয়েলের ঠান্ডা পানি পানকরে আমারা উঁচু নিচু মাটির রাস্তা ধরে এগোতে থাকলাম রাবার বাগানের দিকে।রাবার গাছগুলো শালের মতো লম্বা নয়, কিন্তু ছায়া ঘন, ঢেউয়ের মতো। পাতার মধ্যে আলো ঢুকে নরম, সোনালি পর্দা তৈরি করে। মাটিতে রাবার পাতার নরম গন্ধ লেগে আছে। কোথাও হালকা আর্দ্রতা, কোথাও শুকনো পাতা—সব মিলিয়ে এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি অনুভূত হয়।
আমরা হাঁটতে লাগলাম এবার দেখা হলো,বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, সুবিশাল আনারস বাগান।বনের শেষদিকে গারো পল্লীর দেখা মিলল টিনের ঘর, টিনের চাল,লাল মাটির উঠান, রঙিন ফুলের বাগান,বাড়ির সামনে দোকান। কি সুন্দর যেন ছবির মতো সাজানো। এখানকার নারীরা পিছিয়ে নেই। তাঁরাই এখানকার প্রধান তাঁরা টিকে আছে সময়ের সাথে লড়াই করে এটা আমার অনুপ্রেরণা হয়ে থেকে যাবে। গারো পল্লী থেকে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে হেঁটে হেঁটে সবাই ক্লান্ত হয়ে মাঠে বসে অপেক্ষা করছিলাম দুপুরের খাবারের জন্য এর ফাঁকে ফ্রেমবন্দী হলাম আমি,মনিরা, নিতি, নাফিসা,তাসনিম,মীম,আলী,জয়,আকাশ,প্রিয়াঙ্কা,সনজিত,মাইশাসহ অনেকেই ।খানিক হাসাহাসির পর আমরা খাবার হাতে পেলাম।খাবার শেষে করে উঠে অনুষ্ঠিত হল লটারির ড্র। ছোট বাক্সে ভরা কাগজগুলো একে একে তোলা হলো। কারো হাতে বই, কারো হাতে পানির বোতল, কারো হাতে ফুলের টব, সবাই আনন্দে মেতে উঠল।আমার আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে গেল লটারিতে আমার নাম ওঠাতে,আমি পেলাম ছোট্ট দুটি টিফিন বক্স।বক্স দুটি ছোট্ট হলেও এটি পাওয়ার আনন্দ ছিল বনের মতো বিশাল।
বিকেল নামতে শুরু করলে বন সম্পূর্ণ রূপ বদলায়। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ে সোনালি আলো ছড়ায়। শালপাতার ফাঁক দিয়ে সেই আলো মাটিতে লালচে আভা তৈরি করে।
বন চুপচাপ বলে—“এটাই দিনের শেষ আলো, এটুকু সময় চুপচাপ আমার সঙ্গে থাকো।” বাতাসে শুকনো পাতা, রাবারের গন্ধ, পাখির ডাক—সব মিলিয়ে দিনের শেষ নীরব সিম্ফনি।
গাড়িতে উঠার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকালাম। শালগাছ, রাবারবাগান, টাওয়ার—সব মিলিয়ে মনে হলো, তারা বিদায় জানাচ্ছে। আবার আসব। কারণ মধুপুর শালবন শুধু ভ্রমণের স্থান নয়—এগুলো মানুষের ভেতরের অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে শান্ত করার স্থান।
বাসে উঠে মুন্সি স্যার ও শাহজাহান স্যারকে অনুরোধ করলাম ভ্রমন নিয়ে বলার জন্য ও গান গাওয়ার জন্য এরপর স্যাররা একে একে গান গাইতে শুরু করলেন,তখন সবাই অবাক হলেও মুখে অজান্তে হাসি ফুটে উঠল। বাকিরাও আনন্দের সুরে নিজেদের গলা মেলাতে লাগল। আমরা যারা সাধারণত গাইতে লজ্জা পাই, যারা মঞ্চে বা যেকোনো সামনের জনসমক্ষে গান গাইতে চাই না, তারাও স্যারদের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে নিলাম। হঠাৎ করেই আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত এক আনন্দের সঞ্চার হলো। হাসি, তালি, সুর–বেসুরের সেই অদ্ভুত মিলন যেন পুরো যাত্রার ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে গেল। বাসের ভিতর তখন শুধুই আনন্দের এক স্রোত, যেটা কেবল কণ্ঠস্বরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং চোখে মুখে, প্রতিটি হাওয়ায়, আর মনের আনন্দে ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি বুঝতে পারলাম,গান মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক, মিলন এবং আনন্দের এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ।এই পুরো যাত্রায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাকে সাহস জুগিয়ে গিয়েছে আমার হাজবেন্ড।
বনের নীরবতা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ যত দূরেই যাক, একসময় নিজের ভেতরেই ফিরে আসে। আর সেই ফিরে আসার পথ দেখায় প্রকৃতি। শালগাছ, রাবারগাছ, বাতাস, নীরবতা—সবই। বগুড়ায় ফিরে এসে মনে হলো দিনের আলো শেষ হলেও ভ্রমণ এখনো শেষ হয়নি। সত্যিকারের ভ্রমণ কখনো রাস্তা দিয়ে শেষ হয় না; এটি শেষ হয় মানুষের মনন, স্মৃতি এবং নীরবতার ভেতর। ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষাসফর, মধুপুর শালবনের নিস্তব্ধতা, রাবার বাগানের আলো-ছায়া, গারো পল্লীর হাসি, মনিরার সঙ্গ, দুপুরের খাবার, লটারির উত্তেজনা, স্যারদের গান,হাজবেন্ডের অনুপ্রেরণা সব মিলিয়ে এটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন।
লেখকঃ শিক্ষার্থী,
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ,
সরকারি আজিজুল হক কলেজ বগুড়া।