রাণীনগরে পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রির মহোৎসব

কাজী আনিছুর রহমান,রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ ১৬:৩১ ।
প্রতিবেশী জেলা
পঠিত হয়েছে ১৯ বার।

নওগাঁ জেলাজুড়ে পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রির মহোৎসব। মাটি বিক্রি বর্তমান সময়ে এক আলোচিত ঘটনা। এমন ঘটনার বিরুদ্ধে দিনে কিংবা মধ্যরাতেও প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা, ভেকু মেশিনের ব্যাটারী জব্দ করা কিংবা আর্থিক দন্ড প্রদান করাসহ কোন পদক্ষেপই এমন কর্মকান্ডের লাগাম টানতে পারছে না। জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় সবকটি উপজেলাতে একই দৃশ্য।

প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আওতার বাহিরে হলেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ম্যানেজ হয়ে এই সব কাজ করতে আড়াল থেকে ইন্ধন দিয়ে আসছে মর্মে অভিযোগ উঠেছে। যার কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না মাটি বিক্রির অবৈধ কর্মকান্ডকে। বাঁচানো যাচ্ছে না ফসলী জমি। তবুও জেলাজুড়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

গোপনসূত্রে জানা গেছে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামের আলহাজ্ব ইব্রাহিম প্রামাণিকের ছেলে জাহাঙ্গির আলম বকুল পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজর ফাঁকি দিয়ে কৌশলে পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রির ব্যবসা করে আসছেন। নিজের ১শত বিঘার নাহার মৎস্য খামার প্রকল্পের নাম ভাঙ্গিয়ে অনুমতি ছাড়াই পুকুর সংস্কারের নামে মাটি বিক্রির লোভে পুকুর গভীর থেকে গভীর করার কাজ করে আসছেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় জাহাঙ্গির আলম বকুল বোদলা মৌজার তেবাড়িয়া গ্রামে তার প্রকল্পের প্রায় ৩০বিঘা জমির পুকুর এক মানুষ উচ্চতার মাটি খনন করে ইতোমধ্যেই বিক্রি শেষ করার পর আবার সেই গভীর অংশ থেকে পুনরায় মাটি কেটে বিক্রি করছেন। নিজের ভাইদের অংশ কিনে নিয়ে বকুল মাটি ভর্তি প্রতি ট্রাক্টর ৭শত-১২শত টাকায় বিক্রি করছেন। আর এই সুযোগে স্থানীয় অনেক মানুষ সেই পুকুর খননের মাটি দিয়ে অনুমতি ছাড়াই ফসলী জমি পূরণ করছেন। এতে করে প্রতিনিয়তই হারিয়ে যাচ্ছে ফসলী জমি।

বকুলের মতো মাটি খেকোরা রাতের আঁধারকে কাজে লাগিয়ে মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত এই মাটি কাটার অবৈধ কাজ চালিয়ে আসছে। আর মাটিবাহি ট্রাক্টর ও ড্রাম ট্রাকের চলাচলের কারণে নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ রাস্তা ও সড়ক। এছাড়া পাঁকা সড়কের উপর মাটি পরিবহনের সময় মাটি পড়ে থাকার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনার। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এমন অবৈধ কাজ।

জাহাঙ্গির আলম বকুল মুঠোফোনে জানান তিনি অনুমতি নিয়েই পুকুর সংস্কারের কাজ করছেন। তবে কার অনুমতি নিয়ে কাজ করছেন সেই বিষয়ে কোন উত্তর তিনি দিতে পারেননি। এসিল্যান্ড স্যার নিষেধ করার পর বর্তমানে পুকুর খনন কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

থানার ওসি আব্দুল লতিফ মুঠোফোনে জানান পুকুর খননের অনুমতি পুলিশের প্রদান করার কোন ক্ষমতা নেই। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবেন ইউএনও ও এসিল্যান্ড মহোদয়। যারা পুলিশের অনুমতি প্রদানের কথা বলছেন তারা মিথ্যে বলছেন। পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই কতিপয় ব্যক্তিরা পুলিশের নামে এমন মিথ্যে তথ্য প্রচার করছেন।

সহকারি কমিশনার (ভূমি) নাবিলা ইয়াসমিন জানান প্রথম দিকে খবর পেয়ে বকুলের প্রকল্পে গিয়ে পুকুর খননের কাজ বন্ধ করে ভেকু মেশিনের ব্যাটারী জব্দ করা হয়েছিলো এবং বকুলকে পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছিলো। এরপরও যদি বকুল গোপনে পুকুর খনন করে থাকে তাহলে দ্রুতই তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানার এই কর্মকর্তা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হাসান জানান বিভিন্ন মহলের ইন্ধনের কারণে অবৈধ পুকুর খনন এবং মাটি বিক্রি কোন ভাবেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু মাটি খেকোরা দিনকে নয় রাতের আঁধারকে ব্যবহার করে সেহেতু মাটি কাটার সময় মধ্যরাতেও খবর পেলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভেকুর বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হচ্ছে। আবার যেখানে মাটি খননের সঙ্গে কাউকে পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায়ের ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

তিনি আরো জানান ভূমি সংক্রান্ত নতুন আইন অনুসারে কেউ যদি ফসলী জমি মাটি দিয়ে ভরাট করতে চান সেই কাজের জন্যও প্রশাসনের অনুমতি লাগবে। তাই যারা অনুমতি ছাড়াই ফসলী জমি মাটি দিয়ে ভরাট করছেন দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান এই কর্মকর্তা। তাই উপজেলাজুড়ে অবৈধ মাটি কাটার উৎসব বন্ধ করতে তিনি উপজেলাবাসীর সকল শ্রেণিপেশার মানুষের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।